“যেখান এক মুঠো ভাতই ঈশ্বর”

সেই কেওনঝড়, যেখানে ফাদার স্টেইন ও তার দুই শিশুপুত্রকে জ্বালিয়ে দেয়।


কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে অচেনা অজানা জায়গায় বেড়িয়ে পরার শখটা ছিলই। পূজোর সময় এক বন্ধুকে সঙ্গিও পেয়ে গেলাম। ঠিক হল কেওনঝড় যাব। জায়গাটা বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে উড়িষ্যার মালভুমি অঞ্চলে। এক্সপ্রেসে সময় লাগবে ঘন্টা চারেক, কিন্তু মাঝরাতে গিয়ে পৌছতে হবে। আর একটা বিকল্প ছিল, পুরি প্যাসেঞ্জার, রাত সারেএগারোটায় ছেড়ে ভোরে পৌছনো‌, আমরা এই বিকল্পটাই পছন্দ করলাম। যথা সময় ট্রেন ছাড়ল। সহযাত্রীরা সবাই উড়িষ্যার মানুষ, কলকাতায় কাজ করে, পূজোর ছুটিতে দেশে ফিরছে। ভোরে ট্রেন পৌছল কেওনঝড় রোড স্টেশনে। বাইরে গেলে দেখা যায় বেশ কিছু মানুষ বাসের ছাদে ওঠে। আমিও প্রায়শই ওদের দলেই ভিড়ি। এক্ষেত্রেও তাই করলাম। পাকদন্ডি পথ বেয়ে বেশ কটা ছোট ছোট পাহাড় ডিঙিয়ে ঘন্টা দুয়েক পর এসে পৌছলাম কেওনঝড়। গোটা দুয়েক হোটেল, তার একটাতে উঠলাম। ছোট্ট একটা শহর। পুরো শহরটা ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ঘুরে ফেললাম। আর যে কাজটা করলাম তাহল আমাদের গন্তব্য গোনাসিক পাহাড় বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া। গোনাসিক পাহাড়ের ওপরে গরুর নাকের মতো দেখতে একটা জায়গা বৈতরনী নদীর উৎসমূখ, আমরা সেখানেই যাব। দুটো বিকল্পের সন্ধান পাওয়া গেল, এক জিপ ভাড়া করলে ওপরে তিন কিলোমিটার রাস্তা শুধু হাঁটতে হবে। আর দ্বিতীয় বিকল্প পাহাড়ের ওপর খানিকটা রাস্তা বাসে যাওয়া যেতে পারে, বাকি তেরো কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে যেতে হবে। এটা শোনা মাত্রই এটাই পছন্দ হল, একটু অ্যাডভেঞ্চার হবে। আমরা দ্বিতীয় বিকল্পের জন্য প্রস্তুতি নিলাম, কিছু শুকনো খাবারদাবার কিনে নিলাম এই আরকি। ভোর বেলা বাসে করে নির্দিষ্ট স্থানে এসে নামলাম। এখানে একটা চায়ের দোকান আছে। চা খেয়ে হাঁটা শুরু করব। সারা রাস্তায় আর চায়ের দোকান নেই। চাতালদের খুবই অসুবিধে (মদের নেশাগ্রস্ত দের মাতাল বলা হলে চায়ের নেশাগ্রস্তদের চাতাল বলতে আপত্তি আছে?)। চায়ের দোকানে এক ভদ্রলোক কৌতুহলে আমাদের সঙ্গে এসে আলাপ করলেন। উনি ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অফিসার, পাহাড়ের ওপরেই যাচ্ছেন আদিবাসি গ্রামগুলো পরিদর্শনে। ওনার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত্য জিপে উঠে বসতেই হল। পরে মনে হয়েছে ওনার সঙ্গে গিয়ে লাভই হয়েছে। ওনারা যাওয়ার পথে দুটো গ্রাম ঘুরে গেলেন, আমরা নিজেরা গেলে ওই গ্রাম দেখার অভিঙ্গতাই হত না, ওখানকার মানুষদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে সম্যক ধারনা না নিয়েই শুধু নৈসর্গিক শোভা দেখে ফিরে আসলে ভ্রমনটাই অসম্পূর্ন থেকে যেত। পাতার কুড়ে ঘর, সোজা হয়ে ভেতরে ঢোকা যায়না এতটাই নীচু। ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অফিসার ভদ্রলোককে জিঙ্গেস করলাম, ” এই রুক্ষ পাহাড়ের ওপর এরা খায় কি “। উনি বললেন, “পাহাড়ের কোলে জন্মানো কিছু ফসল, ছোটখাট কিছু শিকার করে — এই”। পাহাড়ের ওপর পৌছে দিয়ে জিপ চলে গেল। আমরা পায়ে পায়ে চললাম বৈতরনীর উৎস সন্ধানে। ফেরার সময় হেঁটেই ফিরতে হবে। নীচে নামছি, এক জায়গায় দেখি হাট বসেছে। পুরোনো কিছু শাড়ি, কাঁচের চুড়ি, আর কিছু টুকটাক জিনিষপত্র, অবশ্যই হাঁড়িয়া আর আছে মোরোগের লড়াই। তবে চা ও বিক্রি করছে একজন। আমরা ভেলিগুড়ের তৈরী চা খেয়ে নিলাম এক ভাঁড়, তারপর ফেরার পথ ধরলাম, ইতিমধ্যে সূর্য্যের আলো কমতে শুরু করেছে সন্ধ্যে নামার আগেই আমাদের ফিরতে হবে। এই সেই কেওনঝড়, যেখানে ফাদার স্টেইন তার দুই শিশুপুত্র নিয়ে ফিরছিলেন। রাত হয়ে যাওয়ায় ঠিক করেন রাতটা গাড়ির মধ্যে কাটিয়ে সকালে ফিরে যাবেন। আর ঐ রাত্রেই ওদের গাড়ি শুদ্ধু জ্বালিয়ে দেয় কিছু লোক। অভিযোগ ফাদার স্টেইন এবং তার লোকজন খাবারের লোভ দেখিয়ে আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করছে। এই খুধার্থ মানুষগুলোর কাছে হিন্দু, মুসলি্‌ম, বৌধ, খৃষ্টান নয় খুধার নিবৃত্তিই একমাত্র ধর্ম, এক মুঠো ভাতই এদের কাছে ঈশ্বর।

Advertisements

3 Responses to “যেখান এক মুঠো ভাতই ঈশ্বর”

  1. Suman Das বলেছেন:

    সত্যি বলতে কি, মানুষ এর সবচেয়ে বড় উৎসব আজ ক্ষুধা, এ নিয়ে আমরা আর যাই করি না কেন, সবশেষে সেই ক্ষুধার আগুনেই জ্বলে পুড়ে মরি, হয়ত বা নিজেদের দুঃখে, নয়ত অন্য কারোর ক্ষুধায়…

  2. mahmud faisal বলেছেন:

    তাপস ভাইয়ের ব্লগের ঠিকানা পাচ্ছিলাম না। আজ চলে এলাম 🙂

    অনেক সত্য একটা কথা বলেছেন সবশেষে। লিখতে থাকুন ভাইয়া।
    আর আমার ব্লগে ঘুরে আসবার জন্য ধন্যবাদ 😀

  3. rongtuli বলেছেন:

    “ক্ষুধার নিবৃত্তিই একমাত্র ধর্ম, একমুঠো ভাতই এদের কাছে ঈশ্বর।”- চমৎকার লাগল লাইন দুটো। এক কথায় পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবিটি ফুটে উঠেছে। মানুষভেদে আর অবস্থাভেদে জীবনের অর্থগুলো কি দারুণভাবেই না বদলে যায়। ভালো লাগল পোস্টটা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: