গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ভূ-উষ্ণায়ন (২)

ভূ-উষ্ণায়ন – ফলাফল


ভূ-উষ্ণায়নের ফলে ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বিগত ৮০০০ বছর ধরে এই তাপমাত্রা প্রায় স্থির ছিল। কিন্তু গত ১০০ বছরের হিসেবে দেখা যাচ্ছে এই তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১০০ বছর আগের তুলনায় ০.৩ ডিগ্রি থেকে ০.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেশী। হিমবাহ গলবে দ্রুত হারে, সমুদ্রের জলতল সেই সূত্রে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়লে বাষ্পীভবনের মাত্রাও বাড়বে। ভৌগলিক নিয়মে সব জলীয় বাষ্প গিয়ে জমা হবে সমুদ্রের ওপর। ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত এর সম্ভাবনাও বাড়বে। ডুবে যেতে পারে উপকুলবর্তী অঞ্চল। ভারত, বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল, মালদ্বীপ এই জায়গাগুলো জলের তলায় তলিয়ে যাবে। তাপমাত্রার বর্তমান বৃদ্ধিতেই ভয়ঙ্কর পরিণতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ফলে খরা-বন্যা, প্রবল বজ্রপাত, ঝড়-ঝঞ্ঝা, প্রলয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু ইত্যাদি নতুন নতুন মারক রোগের উৎপত্তি, কলেরা-ডেঙ্গু-প্লেগ এই সব রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি, শস্যহানি, দেশে দেশে জনজীবন বিপর্যস্ত। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এভাবে চললে তাপমাত্রা বাড়তে পারে ২.৫ থেকে ৫ ডিগ্রি সেন্ত্রিগ্রেড পর্যন্ত। ফলে কি কি ধরনের বিপদ ঘটতে পারে– সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি। এই উচ্চতা ২১০০ সালের মধ্যে ৯ থেকে ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রতীরবর্তী নিচু জায়গাগুলি জলমগ্ন হবে। ভারত, বাংলাদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল, মালদ্বীপ এই জায়গাগুলো জলের তলায় তলিয়ে যাবে। ভারতের ক্ষেত্রে অনুমান ৫৭০০ বর্গ কিলোমিটার জমি এবং ৪২০০ কিলোমিটার রাস্তা জলের নিচে তলিয়ে যাবে।

ভূ-উষ্ণায়ন – প্রতিরোধ


১৯৯২ সালের জুন মাসে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরে বসুধা শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের ১৫০টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কনভেনশনে একটি প্রস্তাবে (ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা U.N.F.C.C.C.) স্বাক্ষর দেয়। প্রস্তাবটি হলো গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির নির্গমন ২০০০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের স্তরে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই কনভেনশনে কোন বাধ্যবাধকতা না থাকায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উন্নত বা মুল গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলি এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আগ্রহী হয় নি। ১৯৯৭ এর ১১ ডিসেম্বর কিয়োটো প্রোটোকল চুড়ান্ত হয়। ঠিক হয় উন্নত দেশগুলো সকলে মিলে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ১৯৯০ সালের স্তরের থেকেও ৫% কমাবে। অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এই চুক্তিতে সই করেনি। সম্প্রতি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শেষ হলো ‘কোপ ১৫’, ভূ-উষ্ণায়ন রোধে এক আন্তর্জাতিক মহাসভা। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যাতে শিল্পায়ন-পূর্ব গড় তাপমাত্রার থেকে দু ডিগ্রীর বেশি না বাড়ে তার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা শুরু করা। উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে অবিলম্বে জীবাশ্ম-জ্বালানী ব্যবহার বন্ধ করা অসম্ভব। পরিবেশ-বান্ধব শক্তি ব্যবহার করতে গেলে তাদের প্রয়োজন অর্থ ও প্রযুক্তি। এই লক্ষ্যে ২০২০ সালের মধ্যে বার্ষিক দশ হাজার কোটি ডলার অনুদান দেবে উন্নত দেশগুলো। প্রতিটি দেশকেই ২০১০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারীর মধ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাদের লক্ষ্যমাত্রা কি জানাতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিযুক্ত হবে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ খতিয়ে দেখার জন্য (ভবিষ্যত বলবে এটা আবার একটা যুদ্ধ লাগানোর ফিকির হয়ে উঠবে কি না)। যা হোক একটা চেষ্টা শুরু হয়েছে-ভারত (০.১২ কে.জি. থেকে ০.০৯ কে.জি.) ও চিন স্বঃতপ্রবৃত্ত হয়ে এই নির্গমন কমিয়ে ফেলছে- বাকিটা দেখা যাক?

ভূভ-উষ্ণায়ন – পরিশেষে


প্রকৃতি তার নিজের মধ্যে নিজেকে সারিয়ে তোলার ব্যবস্থা রেখেছে। গাছপালা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে চলেছে, সমুদ্রের জলও গ্রীনহাউস গ্যাস শোষণ করে চলেছে অবিরত। কিন্তু তারও তো সীমা আছে। আমরা সেই সীমা অতিক্রম করে চলেছি সমানে লাগামহীন ভাবে। আবার বৃক্ষনিধনের মাধ্যমে সেই সীমাকেও টেনে নামিয়ে আনছি। এই রক্ষাকবজগুলোকে যে কোনও মূল্যে রক্ষা করার সময় এসে গেছে। রাষ্ট্রনায়করা শুনছেন কি?

Advertisements

2 Responses to গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ভূ-উষ্ণায়ন (২)

  1. imraniut বলেছেন:

    ব্লগটা ভাল লেগেছে। মুগ্ধতা রেখে গেলাম।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: