সম্মানের জন্য হত্যা (Honour Killing)


সম্প্রতি বাইশ বছরের তরুনী সাংবাদিক নিরুপমা পাঠকের হত্যার খবর আমাদের আলোরিত করেছে।ঝাড়খন্ডের বাসিন্দা নিরুপমা দিল্লিতে মাস কমিউনিকেশন এর পাঠ শেষ করে দিল্লিরই একটা সংবাদপত্রে চাকরি করছিলেন। কলেজে পড়ার সময়েই পরিচয় হয় প্রিয়ভাংশু রঞ্জনের সঙ্গে, পরে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতা মেনে নিতে পারেনি নিরুপমার পরিবার, কারন প্রিয়ভাংশু অপেক্ষাকৃত নীচু জাত। সেই কারনে, তথাকথিত সম্মান রক্ষার জন্য নিরুপমাকে হত্যা করে তার পরিবার। মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে নিরুপমার মা শুভা পাঠক এখন হাজতে।
(সম্প্রতি ‘মনন মন’ ও ‘তুসিনের’ ব্লগে Mothers’ Day বা মাতৃ দিবস উপলক্ষে সুন্দর দু’টো লেখা পড়লাম। ওরা ওদের মায়ের কথা লিখেছে। এও এক ‘মা’) নিরুপমা রাজধানীর সংবাদপত্রকর্মী ছিল। তার মৃত্যুর পর সহকর্মীরা যেভাবে সক্রিয় প্রতিবাদে নামে, মিছিল করে, তাতে করে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু ভারতবর্ষের, বিষেশতঃ উত্তর ভারতের আনাচে কানাচে যে নিরুপমারা প্রতিনিয়ত এই কুসংস্কারের বলি হচ্ছে তাদের খবর আমাদের কাছে পৌছয় না, অপরাধীদের শাস্তি দুরস্ত।

প্রাচীন মহাকাব্যে আমরা দেখেছি রামচন্দ্র সীতাকে লঙ্কা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার পরে তার সূচীতা বা সতীত্ব প্রমানে প্রকাশ্য রাজসভায় অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। অগ্নিপ্রীক্ষায় উত্তীর্ন হওয়ার পরে সীতা আর বেঁচে থাকতে চান না, পাতালে প্রবেশ করেন। ধরণী দু’ভাগ হয়ে সীতা কে আশ্রয় দেয়। মহাকাব্যে যতই অগ্নিপরীক্ষা-পাতাল প্রবেশ বলে আড়াল করার চেষ্টা করা হোক না কেন সীতাকে যে রাজপরিবারের সম্মানের জন্য পুড়িয়ে মারা হয়েছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

বাংলার নবজাগরণের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সমাজের প্রবল বাধা উপেক্ষা করে সহমরণ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ প্রবর্তন, বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ প্রথা রদ করা-সহ নারী শিক্ষা প্রচলনের দ্বারা যুগপৎ নারীদের ওপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভয়ঙ্কর শোষণ ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে, অসহনীয় নির্মম কঠিন নিয়মতান্ত্রিক সামাজিক আচারে বিনা শিক্ষায় নারীদের শৃঙ্খলিত করে রেখেছিল তৎকালীন সমাজের স্বঘোষিত যে পান্ডারা, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন তৈরী করে–সেই ভয়ঙ্কর রক্ষণশীলতা থেকে, সেই অচলায়তনের নিগর থেকে মুক্ত করে নতুন কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ে তোলায় তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলা সেই উত্তরাধিকার বহন করে চললেও বাকী ভারতএ যে সে আলোর ছোঁয়া লাগেনি তা বারে বারেই প্রকাশিত হচ্ছে। তবে শুধু ভারতের কথা বললে ভুল হবে, অন্যান্য দেশগুলোতে কিছু কিছু ঘটনা ঘটলেও এটা মূলত এই উপমহাদেশেরই একটা ব্যাধি। মৌলবাদী, সংরক্ষণবাদীদের প্রত্যক্ষ মদতে প্রশাসন এবং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে স্বঘোষিত পঞ্চায়েতগুলি বিচারের নামে প্রহসন করে এই হত্যালীলা চলছে। সব থেকে আশ্চর্য্যের যে সম্মানের জন্য হত্যাকারী স্বয়ং বাবা বা ভাই বা মেয়েটির নিজের পরিবারের অন্য কেউ। কোথাও কোথাও দুটি প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের ভালোবাসার অপরাধে দু’জনকেই প্রাণদন্ড দেওয়া হয়। আবার একের অপরাধে ওই পরিবারের অন্য মহিলাকে গণধর্ষণের নজিরও বিরল নয়। পাকিস্তানের ‘মুখতারবাঈ ধর্ষণের ঘটনা তারই একটি নিকৃষ্ট নজির।

উদাহরন দিতে গেলে পাতার পর পাতা ভরে যাবে, তবে দু’একটা দিতেই হয়।

হরিয়ানা রোহতকের একজন নিচুজাতের ছেলে সঞ্জয় ভালোবেসে বিয়ে করেছিল উচ্চবর্ণের পন্ডিত পরিবারের মেয়ে রেখাকে। এই বিয়ে মানতে পারেনি রেখার পরিবার-তাই একদিন রাত্রে ভাড়াটে গুন্ডা পাঠিয়ে হত্যা করা হয় সঞ্জয়কে। রেখা এবং তার ননদ অঞ্জুকেও গুলি করা হয়, সঞ্জয়ের মা কৃষ্ণাদেবীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। আহত রেখা পরে হাসপাতালে একটি সন্তানের জন্ম দেয়। বর্তমানে সে তার স্বামীর হত্যাকারী পিতার গৃহে গৃহবন্দি।

হরিয়ানার ঝাঝঁর গ্রামের এক ছেলের প্রেমে পরে এক পরিবারের দুই বোনের বড় বোন। ওরা বিয়ে গ্রাম থেকে পালিয়ে গেলে ছোট বোনও তাদের সঙ্গে বেড়িয়ে পরে, কারন দিদিকে না পেলে বাবা-কাকারা তার ওপর অত্যাচার করবে। কিন্তু এতেও এরা রেহাই পায়নি। পুলিশের সাহায্যে ওই দুই বোনকে বাড়িতে এনে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়।

তবে প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটছে। সেই কথাগুলো বাদ দিলে অবিচার হবে ।

হরিয়ানার-ই কারোদা গ্রামের মনোজ ভালোবেসে বিয়ে করেছিল পাশের গ্রামের মেয়ে বাবলিকে। তারা দুজনে বিয়ে করে দিল্লিতে থাকার সব ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু বাবলির বাবা মনোজের বিরুদ্ধে মেয়ে অপহরণের মামলা করায় মনোজ বাবলিকে নিয়ে কোর্টে হাজিরা দিতে আসে। কোর্টে বাবলি লিখিত জানায় যে সে মনোজকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছে। কিন্তু কোর্ট থেকে ফেরার পথে বাস থেকে জোর করে নামিয়ে দুজনকে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রে কিন্তু মনোজের মা চন্দ্রাবতী দেবী নীরবে মেনে নেয়নি। সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছেন।

এবারের ঘটনা উত্তরপ্রদেশের খালিলাবাদ গ্রামের। হতভাগ্য মেয়েটি ভালোবেসেছিলো গ্রামেরই একটি ছেলেকে। কিন্তু এটা মেনে নিতে পারেনি তার পরিবার। একদিন মেয়েটিকে তার বাবা ও পরিবারের আরও কয়েকজন মিলে মন্দিরে নিয়ে যায় এবং ফেরার পথে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে তার বাবা। মেয়ের এমন নির্মম মৃত্যুর পরে আর চুপ করে থাকতে পারেনি মেয়েটির মা। তিনিই পুলিশের কাছে গিয়ে ঘটনাটি জানিয়ে এফ.আই.আর. দায়ের করেছেন নিজের স্বামী-সহ পরিবারের তিন জনের নামে।

উদাহরণ আরও অসংখ্য দেওয়া যায়। আশার কথা হল এই সব হতভাগ্যদের পাশে দাঁড়িয়ে হরিয়ানা গনতান্ত্রিক মহিলা সমিতি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাংসদ বৃন্দা কারাত রাজ্যসভায় বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। কিন্তু ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা অসম্ভব। সবার আগে মেয়েদেরও শুধু মাত্র ভোগের সামগ্রী বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র না ভেবে মানুষ বলে ভাবতে হবে-শুধু মুখের কথায়ই নয়, অন্তর দিয়ে।

Advertisements

10 Responses to সম্মানের জন্য হত্যা (Honour Killing)

  1. শুধুই মন খারাপ হইলো…

    😦

  2. সৌম বলেছেন:

    এদের সম্মান খুব দামী। মেয়ের থেকেও।

  3. তারা বলেছেন:

    মর্মান্তিক ঘটনাগুলো খবরের কাগজে দেখছিলাম। সেগুলো নিয়ে ভালো লিখেছ।

  4. rongtuli বলেছেন:

    “সবার আগে মেয়েদেরও শুধু মাত্র ভোগের সামগ্রী বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র না ভেবে মানুষ বলে ভাবতে হবে-শুধু মুখের কথায়ই নয়, অন্তর দিয়ে।”- ভাল লাগল কথাটা। এই শুদ্ধবুদ্ধির উদয় হোক সবার মাঝে এই কামনাই করি।

  5. Rafi বলেছেন:

    ভালো লিখেছ। বিতর্কিত কিছু কথাও। Good Good.

  6. রনি পারভেজ বলেছেন:

    😦 মনটা খারাপ হয়ে গেল 😦

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: