ব্যবসা-ভিক্ষাবৃত্তি


গাড়ি করে চলেছেন গন্তব্যের দিকে- ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পরেছেন-একটা অপরিচ্ছন্ন, অশক্ত, অভুক্ত মানুষের করুন হাত আপনার দিকে এগিয়ে এলো-”দুটো পয়সা দেবেন”- এ অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কম বেশী আছে। বড় বড় রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, মন্দির-মসজিদ বা যেখানে লোক সমাগম বেশী সেখানে এদের উপস্থিতি আমাদের সবারই নজরে পরে প্রতিনিয়তই। ছোট ছোট শিশু, অস্থিচর্মসার বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, রুগ্ন মহিলা এবং শারীরিক প্রতিবন্ধি মানুষগুলোর ভিক্ষের জন্য করুণ আর্তিতে বেদনাহত হয়ে বা অনেক সময় পূণ্যলাভের আশায় -আমরা কিছু সাহায্য করি। কিন্তু আমরা যেটা অনেকেই জানিনা যে ওই ভিক্ষার অর্থ যা আমরা ভিখিরিটির হাতে তুলে দিলাম তাতে হয়তো তার কোনোই অধিকার নেই।
সে হয়ত এক বিরাট এবং শক্তিশালী ভিক্ষা-ব্যবসা গোষ্ঠির সামান্য কর্মচারী মাত্র। রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাস, বড় বড় মন্দির-মসজিদ এই জায়গাগুলো, যেখানে প্রচুর লোক সমাগম হয় সে সব জায়গায় এই চক্রগুলো বিশেষভাবে সক্রিয়। এই চক্রের লোকেরা এদের জন্য আস্তানার, খাবারের, পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করে পরিবর্তে তাদের ভিক্ষালব্ধ রোজকারের বেশী অংশই নিয়ে নেয়। এখন কথা হল ভিখিরিরা এদের খপ্পরে পরে কেন? যারা প্রতিবন্ধি তাদের ক্ষেত্রে নির্ভর করা ছাড়া গতি নেই আবার অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়গা থেকে এদের-বিষেশত প্রতিবন্ধি ভিক্ষুক যাদের ভিক্ষার বাজারে দামী মনে করে, সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হয়, কিন্তু যারা চলতে ফিরতে পারে তাদেরও ভিক্ষার একটা অংশ তোলা হিসেবে দিতে হয়। কারন এদের চক্রে না যুক্ত হলে কেউ ঐ সব জায়গায় ভিক্ষা করতে পারবে না। ফলে এরা বাধ্য এদের জালে পরতে। মহিলা ভিখিরিদের অনেক সময় দেখা যায় কোলে বাচ্ছা নিয়ে – তাতে দাতার মন ভেঁজাতে সুবিধে হয় এবং এই বাচ্ছাগুলো তাদের নিজেদের নাও হতে পারে-হতে পারে চুরি করা। অনেক সময় এই বাচ্ছাগুলোকে চড়া ঘুমের অসুধ খাইয়ে ঘুম পারিয়ে সেই অসুস্থ বাচ্ছার চিকিৎসা জন্য সাহায্য চায়। এইভাবে দিনের পর দিন ঘুমের অসুধের প্রভাবে থাকতে থাকতে একদিন এরা প্রকৃতই অসুস্থ হয়ে পরে। এইভাবে অনেক প্রাণ অকালেই ঝড়ে যায়। আর এর পরেও যারা বেঁচে থাকে তারা এই চক্রেরই অংশ হয়ে ব্যবস্থাটাকে বয়ে নিয়ে চলে।

দেশে অনেক N.G.O. আছে, আছে বাঘা বাঘা Human Right কর্মী ও N.G.O. তারাও বোধহয় এই বিষয়টা নিয়ে ততটা আগ্রহী নয়। জানি না কেন? হয়তো এতে তেমন প্রচার নেই বা দেশী-বিদেশী অর্থও হয়তো নেই। যে কারনই থাকুক এই বিষয়ে এদের অস্তিত্ব চোখে পরে না। Street Children নিয়ে কিছু N.G.O. কাজ করে। তাদের কাজের মূল্যায়ন এখানে আর নাই বা করলাম। Human Right Organisation গুলো প্রকৃতই মানবাধিকার রক্ষার জন্য কাজ করে না রাজনীতি করে সেটা আমার কাছে খুব স্পষ্ট নয়।

সরকারের Eradication and Control of Beggary জন্য দপ্তর আছে। কিন্তু যে আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়ায় একজন মানুষ ভিখিরিতে পরিনত হয় সেটাকে নির্মূল না করে শুধুমাত্র ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা কি সম্ভব? এরা কিছু হোম বানিয়ে এদের খাইয়ে পরিয়ে রাখে। কিন্তু সেটা ক’জনকে আর। এর বাইরে হাজার হাজার মানুষ আছে তাদের কি হবে? আবার অন্য একটা কূট বিতর্কও আছে সেটা হলো শুধুমাত্র ভিক্ষাবৃত্তির কারনে মানুষকে হোমে আটকে রাখা মানে তাদের মানবাধিকার হরণ করা।

তাহলে কি করা যায়? না এ বিষয়ে আমার কি মত এই লেখায় আর লিখলাম না। বরং বিতর্কটা তুলে দিলাম। বাঙালীর একটা বদনাম আছে- বাঙালী তর্কপ্রিয় জাত। দেখা যাক তর্কে বহুদূর যায় কি না।

Advertisements

12 Responses to ব্যবসা-ভিক্ষাবৃত্তি

  1. সঞ্জয় বলেছেন:

    যে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা একজন মানুষকে ভিখিরিতে পরিনত করে হয় সেইব্যবস্থাটাকে নির্মূল করাই একমাত্র ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করার পথ .

  2. সুন্দর পোস্টটির জন্য কৃতজ্ঞতা ভাই।
    বিষয়টি খুবই জটিল। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এটা একটি নিত্য ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই বুঝি, কিন্তু কেমন যেন একটা অসহায়বোধ কাজ করে। মনে হয় কিছুই যেন করার নেই আমাদের। দারিদ্রের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে না পারলে এই প্রবনতা আরো বাড়বে বৈকি। যথাযথ শিক্ষা বিশেষ করে কারিগরী ও কর্মমুখী শিক্ষা ও সর্বপরী মানুষের জীবন যাপনের মান উন্নয়ন করা গেলে কিছুটা কমবে এই ব্যবসা। পুরপুরি কমবে না এই অর্থে যে, উন্নত বিশ্বেও ভিক্ষাবৃত্তি বা ব্যবসার খবর হর হামেশাই আমরা দেখছি।
    শুভেচ্ছা তাপস দা।

    • তাপস বলেছেন:

      তোমার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আমার নেট কানেকশনে এত সমস্যা হচ্ছে যে প্রায় ১৫ দিন লগ-ইন করতেই পারিনি।

  3. সৌম বলেছেন:

    N.G.O. গুলো এই মুস্তানদের দ্বারা ভিখিরিদের শোষন বন্ধ রুখতে ব্যবস্থা নিতে পারে। তারা খালি প্রচার আর পয়সা রোজকারেই ব্যস্ত।

  4. Rafi বলেছেন:

    এই অর্গানাইজড বিখিরিদের গ্রুপগুলোর সঙ্গে পুলিশের যোগসাজস আছে, না এভাবে এরা ব্যবসা করতে পারে না। এর থেকে মুক্তি পেতে বিদেশের ধাঁচে রাত্রিকালীন আবাসের মতো করলে কেমন হয়। যেখানে স্বেচ্ছায় তারা আসবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে খাবারও দেওয়া হবে।

  5. তারা বলেছেন:

    প্রশিক্ষণ দিয়ে মূল স্রোতে নিয়ে আসা-এই নিয়ে কাজ হচ্ছে না তা নয়, মানে প্রশিক্ষনের কাজ। কিন্তু বাইরের লোকের সংগে প্রতিযোগিতায় এরা যুঝতে পারবে কি? পারছে না। কিছু দিনের মধ্যেই আবার সেই ঠিকানা-ফুটপাথ।

  6. নিবিড় বলেছেন:

    আমাদের যে সামাজিক কাঠামো তাতে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা সহজ কাজ না। একে তো হিন্দু বলুন আর মুসলিম বলুন আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী পূর্ণ লাভের অতি সহজ উপায় হল ভিক্ষা প্রদান। তাই সহজ উপায়ে স্বর্গ প্রাপ্তির উপায় হিসেবে আমরা ভিক্ষা যে চাচ্ছে সে সত্যিকারের দাবিদার কিনা, কিংবা সে আসলেই ভিক্ষা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে কিনা তা চিন্তা করে রাস্তাঘাটে ভিক্ষা দিচ্ছি। তাই অনেক সময় আমি অনেককেই বিনা বাক্যবয়ে অনেক শারীরিক ভাবে সার্মথ্যবান লোকজনকেও ভিক্ষা দিতে দেখেছি। আর একটা লোক যখন কিছু না করেই ভিক্ষা পাচ্ছে তখন সে কেন অন্য কোন পেশায় যাবে? এ জায়গাটায় আমরা আমাদের দায় এড়াতে পারি না।

    আর আমার মতে এখানে প্রধান ব্যাপার হল- সামাজিক বৈষম্য। যতদিন সামাজিক কাঠামো থেকে দূর না করা যাক অন্তত সহনশীল মাত্রায় না আনা যাচ্ছে ততদিন এই পেশা রয়েই যাবে। আবার এই ভিক্ষা বৃত্তি কে দূর করার জন্য কোন হোমে ভিক্ষুকদের আটকে রাখাকেও আমি সমর্থন করতে পারি না। এটা ভিক্ষা বৃত্তি দূর করার কোন বাস্তব সম্মত উপায় হতে পারে না। কারণ সরকার কখনই বৈষম্যের শিকার সমগ্র জনগোষ্ঠী কে হোমে জায়গা দিতে পারবে না। বরং সরকার যেন এই লোকগুলো অন্য কোন পেশায় স্থানান্তরিত হতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আর ঋণ ব্যবস্থা করতে পারে।

    অন্য আরেকটা জিনিস হল সমাজে প্রতিবন্ধী জনগষ্ঠীর প্রতি আমাদের মানসিকতা। এটাও অনেক সময় দরিদ্রদের মাঝে আর দরিদ্র প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী কে আর প্রন্তিক অবস্থায় ঠেলে দেয়। আর বেশী কথা না বাড়ানোই ভাল, নাইলে মূল পোস্টের থেকে মন্তব্যই বড় হয়ে যেতে পারে 😀

    • তাপস বলেছেন:

      মুল পোস্টের থেকে বড় যদি হয়েও যেত তাতে মূল পোস্টটাই সমৃদ্ধ হত। খুব সুন্দর বিশ্লেষন করেছ, এবং বিতর্কটাও আমার অনুরোধ মত তুমি তুলে দিলে তার জন্য ধন্যবাদ জানাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: