“জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড”


২৫ বছরেরও বেশি সময় লাগল ভুপাল গ্যাস দুর্ঘটনার বিচার শেষ হতে। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য নিযুক্ত চেয়ারপার্সন কে.জি. বালকৃষ্ণণও মানছেন যে রায় বেরোতে বেশ দেরিই হয়েছে। কিন্তু শুধুই কি দেরি- যে দুর্ঘটনায় ২৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হল, যে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে গেল আরও কয়েকটি প্রজন্ম, যে দুর্ঘটনার জেরে আজও জন্মাচ্ছে বিকলাঙ্গ শিশু-সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাজা মাত্র দু’বছর? এই ২৫ বছরে আক্রান্তদের অনেকেই মারা গেছেন, আর যারা এখনও বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে অনেকে শরীরে বিষ নিয়ে প্রতিদিনকার জীবনসংগ্রামে লড়াই করতে করতে হতাশায় মানসিক রোগগ্রস্ত- যাদের সামান্য আয়ের সিংহভাগই খরচ হয়ে যায় চিকিৎসায় – শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের আশায় বুক বেধে দলে দলে হাজির হয়েছিলেন আদালতের বাইরে। তাদের কাছে এই রায় কি বার্তা বয়ে আনে, রাষ্ট্রের প্রতি- বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাদের কতটা আস্থাশীল করতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই দীর্ঘ সময়ে নদীতে অনেক জল বয়ে গেছে- আক্রান্ত মানুষগুলো এবং কিছু নাছোড়বান্দা মানুষ-N.G.O. কর্মী বাদ দিয়ে বাকি ভারতবাসী ঐ ঘটনার কথা-ঐ মানুষগুলোর কথা ভুলেই গেছে। যাদের বয়স কম তারা জানেই না এই ঘটনার কথা। বিচারে দেরীর কি এটাই উদ্দেশ্য?


কি ঘটেছিল সে দিন?

২রা ডিসেম্বর, ১৯৮৪ – মধ্যরাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে অচৈতন্য তখন ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট (মিক) গ্যাসের প্রভাবে কয়েক মুহূর্তেই মৃত্যু হয়েছিল প্রায় আড়াই হাজার মানুষের।

৩রা ডিসেম্বর, ১৯৮৪ – মৃত্যুর সংখা পৌছে যায় পঁচিশ হাজারের আসেপাশে। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন আরও প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ।

৪ঠা ডিসেম্বর, ১৯৮৪ – ইউনিয়ন কার্বাইডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ইউনিয়ন কার্বাইডের চেয়ারম্যান ওয়ারেন অ্যান্ডারসন গ্রেফতার হন এবং পরে মধ্যপ্রদেশ পুলিশ তাকে জামিনে ছেড়ে দেয়।

৬ই ডিসেম্বর, ১৯৮৪ – মামলাটি সিবিআই এর হাতে দেওয়া হয়।

ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৫ – আমেরিকার একটি আদালতে ভারত সরকার ইউনিয়ন কার্বাইডের কাছে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরন দাবী করে।

১লা ডিসেম্বর, ১৯৮৭ – তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেয় সিবিআই। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০৪-২ ও ৩২৬ ধারায় অভিযুক্ত করা হয়।

ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৯ – বারবার সমন উপেক্ষা করায় ওয়ারেন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি।

ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৯ – আদালতের বাইরে সরকার ও ইউনিয়ন কার্বাইডের সমঝোতায় সংস্থা ৪৭০ মিলিয়ন ডলার দেয়।

ফেব্রুয়ারী, ১৯৯২ – আক্রান্তদের মধ্যে প্রাপ্ত অর্থের একাংশ বিলিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের সমন উপেক্ষা করায় ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে অনিশ্চিত ঘোষণা করা হয়।

১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬ – অভিযুক্তরা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে, অপরাধের গুরুত্ব লঘু করে সর্ব্বোচ্চ আদালত তাদের বিরুদ্ধে ধারার পরিবর্তন করে এবং অভিযুক্তদের ৩০৪-এ, ৩৩৬, ৩৩৭ ধারায় বিচার করার কথা বলা হয়।

ফেব্রুয়ারী, ২০০১ – ভারতীয় শাখার দায় নিতে অস্বীকার করল ইউনিয়ন কার্বাইড।

মে, ২০০৩ – আমেরিকার কাছে ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে প্রত্যর্পণের আর্জি।

জুন, ২০০৪ – ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে প্রত্যর্পণের আর্জি খারিজ করল আমেরিকা।

অক্টোবর, ২০০৪ – ইউনিয়ন কার্বাইড প্রদত্ত ৪৭০ মিলিয়ন ডলারের বাকি টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের দিতে বলে সুপ্রিম কোর্ট।

৭ জুন, ২০১০ – অভিযুক্ত আট জনকে দোষী সাব্যস্ত করে সি.জে.এম.। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জামিন পেয়ে যায় অভিযুক্তরা। ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার ইউনিয়ন কার্বাইডের।

দুর্গত মানুষগুলো আইনের মারপ্যাচ কারন তারাতো আর জানতেন না যে ১৯৯৬ সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ২৫০০০ মানুষের মৃত্যু এক সাধারন পথ দুর্ঘটনার সমান করে দিয়েছেন। ফলে এর বেশী শাস্তি এই মামলা থেকে আশা করা যায়না। কিন্তু এই রায় বেরনোর পর যেটা হয়েছে সেটা হল বিস্মৃতির গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনা আবার সারা দেশবাসীর সামনে ঊঠে এসেছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমও এখন বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে যদিও বহুজাতিক সংস্থার বিরুদ্ধে তারা বিশেষ যায়না বলে অভিযোগ । চাপে পরে সরকারকেও কিছু তৎপরতা দেখাতে হচ্ছে। ফল কি হয় এখন তাই দেখার।

Advertisements

10 Responses to “জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড”

  1. sanjoydas বলেছেন:

    দেশপ্রেমিক হিসাবে প্রতিবাদ প্রতিরোধে সামিল হতে হবে.

  2. কাজল বলেছেন:

    সরকার নতুন করে সাহায্য করছে। বিরোধিরাই বা এতদিন চুপচাপ ছিল কেন? রহস্যটা কি?

  3. সৌম বলেছেন:

    আরে এখানে সব হিরোশিমা দিবস পালন করে, ভুপাল দিবসও পালন করা উচিত।

  4. তারা বলেছেন:

    আবার কিছুদিন হইচই হবে তারপর যে কে সেই। মানুষ গুলোর কথা কেউ ভাববে না। মানুষের কোন দাম নেই আমাদের নেতাদের কাছে।

  5. রফি বলেছেন:

    আইন বিচার সব বড়লোকদের জন্য সেটাই প্রমান হল।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: