বিচারের বাণী………


পৃথিবীর ইতিহাসে বৃহত্তম গ্যাস দুর্ঘটনায় আদালতের রায় প্রকাশিত হওয়ার পরে সারা দেশ জুড়ে উঠেছে প্রবল সমালোচনার ঝড়। শুধু দেশেই নয়, বিদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রেও এই খবর গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছে এবং সমালোচিত হয়েছে এই রায়। স্বাভাবিকভাবে সেই অবধারিত প্রশ্নটাই উঠে এসেছে– ‘ভারতের বিচার ব্যবস্থা বিত্তশালী ও প্রভাবশালীদের পক্ষে’ বা ‘বিচারও ক্রয়যোগ্য পণ্য’। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এ. এম. আহমেদি কথাই ধরা যাক– ১৯৯৪ সালে

( # ধুমপানের বিপদ সম্পর্কে অবহিত না করার জন্য তামাক কোম্পানি ‘ফিলিপ্স
মরিস’ কে জরিমানা দিতে হয়েছিল ৩ বিলিয়ন ডলার।
# এ্যসবেসটস কোম্পানি ‘জন্স মারভিল’ কে জরিমানা দিতে হয়েছিল ৫০০ মিলিয়ন
ডলার।
# ১৯৮৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা উপকুলে ‘এক্সন ভ্যালডেজ’ দুর্ঘটনা– এই
তেল দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয়েছিল প্রকৃতির-উদ্ভিদ, জীবজন্তুর- ক্ষতিপূরণ ধার্য হয়েছিল ১০০ কোটি ডলার।
# ভুপাল গ্যাস দূর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ মাত্র ৪৭০ মিলিয়ন ডলার। )

N.G.O. গুলোর প্রবল বাধা উপেক্ষা করে ভুপাল কোর্টের রায় বাতিল করে ইউনিয়ন কার্বাইড কোম্পানির শেয়ার বিক্রির অনুমতি দেয় সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ যার মাথায় ছিলেন ব্বিচারপতি আহমেদি। দু’বছর বাদে এই আহমেদিই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ লঘু করে দেয়। (আহমেদি সাহেব চাকরি থেকে অবসরের পর মূলত দুর্ঘটনার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসার জন্য গঠিত ‘ভুপাল মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্র’ এর ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান হন। উনি সিদ্ধান্ত নেন যে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা ওই হাসপাতালে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাবে। বিচারপতি আহমেদি নিজেই ওই হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছেন)। বিচার ব্যবস্থা বলতে শুধু আদালতের কথা বললে চলবে না। তদন্তকারী সংস্থা যারা মামলা সাজাবে তাদেরকেও ধরতে হবে। সি.বি.আই প্রথমে ৩০৪-২ ও ৩২৬ ধারায় অভিযুক্ত করে যে মামলা করেছিল তাতে সর্বোচ্চ ১০ বছর সাজা হতে পারত। অনেকেরই মতে এটাই যথেষ্ট কম ছিল। কিন্তু কেস ঠিক মতো না সাজানোর অজুহাতে ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট মামলা আরও লঘু করে দেয়। এবং এর বিরুদ্ধে সি.বি.আই. আর কোন আবেদনই করেনি। আর ভুপালের ক্ষেত্রে সরকারও দায় এড়াতে পারে কি? সি.বি.আই. তদন্তকারী সংস্থা কিন্তু স্বাধীন কি? একেবারেই না। যারা কথায় কথায় সি.বি.আই-সি.বি.আই করেন তারাও ভালমত জানেন যে সি.বি.আই. কে কেন্দ্রীয় সরকারের কথা মত চলতে হয়। সেই সি.বি.আই. এর তৎকালীন যুগ্ম অধিকর্তা বি.আর. লাল অভিযোগ করেছেন এই মামলার ব্যাপারে বিদেশ মন্ত্রকের চাপ ছিল। সরকারের নির্দেশ ছিল অ্যান্ডারসনকে প্রত্যর্পণের ব্যাপারে না এগোনর। যেমন ভুপালের তৎকালীন জেলা শাসক মতি সিং বলেছেন ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে রাজ্যের মূখ্যসচিবের নির্দেশের কথা। তৎকালীন পুলিশ সুপার স্বরাজ পূরি, যিনি অ্যান্ডারসনকে গ্রেপ্তার করেছিলেন এবং পরে পালাতে সাহায্য করেন, তিনিও বলেছেন মূখ্যসচিবের নির্দেশের কথা। তৎকালীন মধ্যপ্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিং সেই সময় বলেছিলেন আইন সৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় অ্যান্ডারসনকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্বতন বিদেশ সচিব M. K. Rasgotra বলেছেন তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাওএর নির্দেশ ছিল অ্যান্ডারসনকে নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়ে চলে যেতে দেবার। তিনি আরও বলেছেন যে মার্কিন হাই-কমিশনের ডেপুটি চিফ গর্ডন স্টিব বলেছিলেন সেফ প্যাসেজ দেওয়ার জন্য। বর্তমানে এতো বিতর্কের মধ্যেও অর্জুন সিং এর মতো প্রগলভ মানুষ আশ্চর্যজনকভাবে নিরব। এসবে বোঝা যায় যে সরকার আর্ত দেশবাসীর স্বার্থের থেকেও বহুজাতিক কোম্পানি ও তার মালিকের স্বার্থ রক্ষায় বেশী সক্রিয় ছিল। সরকার কখনও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টা দেখেনি। প্রথমতঃ ওয়ারেন অ্যান্ডারসনকে গ্রেফতার করেও মাত্র ২৫ হাজার টাকা জামিনে এবং আদালত ডাকলেই তিনি হাজির হবেন এই সর্তে ছেড়ে দেওয়া হল এবং সরকারের ব্যবস্থাপনায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হল। ঘটনার ১৯ বছর পরে সরকারি ভাবে তাকে প্রত্যর্পণের আর্জি জানায় ভারত সরকার। তাও ঠিকমতো আবেদন না জানানোর অজুহাতে সেই আবেদন খারিজ করে আমেরিকা। অথচ এর পরেও এতো বছরে সরকারের তরফে আর কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এখন দেশ জুড়ে আলোরন সৃষ্টি হওয়ায় কারনে বা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নাম জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কিম্বা হয়তো বা ‘পরমানু দায়বদ্ধতা বিল’ পাশ করানোর সুপ্ত তাগিদে সরকার সক্রিয় হয়ে তরিঘরি পুরনো মন্ত্রীগোষ্ঠী বাতিল করে নতুন মন্ত্রীগোষ্ঠী তৈরী করে বিতর্ক চাপা দেওয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হয়েছে।

Advertisements

8 Responses to বিচারের বাণী………

  1. রথীন্দ্র ভারতী বলেছেন:

    শুধু বিচারপতিদের দোষ না দিয়ে, আমাদের এটাও ভেবে দেখা উচিত কারা বিচার কে বা কারা প্রহশনে পরিনত করছে/ যে দেশে বার বার অপশরাধীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হ্য়/ সে দেশে ত‌‍ত্‍কালীন রাজনেতাদের এবিষয়ে ভুমিকা নিয়েও আলোচনা আশা করব/

  2. এত প্যাচ নিয়ে মানুষ যে কিভাবে চলে আমি মাঝে মাঝে বুঝতে পারি না … সামান্য একটু সরল থাকার চেষ্টা করলেই সারা পৃথিবীটা কতইনা সুন্দর হত !

  3. সৌম বলেছেন:

    বিচারপতিদের আগে বিচারের আওতায় আসা উচিত।

  4. মুশারফ বলেছেন:

    বহুজাতিক কোপমানীর স্বার্থরক্ষা সরকারের প্রধান কাজ। আম্বানীদের জন্য কেমন তেলের দাম বাড়াল।

  5. তারা বলেছেন:

    ইউনিয়ন কার্বাইড কত টাকা ছড়িয়েছিল কে জানে? আমাদের দেশে পয়সায় সবই হয়।

  6. রফি বলেছেন:

    কিছু লোক কিছু হলেই সি.বি.আই.-সি.বি.আই. করে চেঁচায়, আদালতে ছোটে। সি.বি.আই. এর অফিসাররা আর বিচারপতিরা যেন সব স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: