বিশ্ব-উৎসবের শেষে


শেষ হয়ে গেল বিশ্বকাপ ফুটবল। এক মাস ব্যপি উৎসবের সমাপ্তি। রাত জেগে খেলা দেখা, পরদিন ঢুলুঢুলু চোখে অফিস যাওয়া। ফাইনাল খেলার দিন ভাবছি যেন ৯০ মিনিটেই খেলার নিষ্পত্তি হয়, তাহলে অন্তত পৌনে দু’টোয় শুতে পারব। কিন্তু না একস্ট্রা টাইমে গেলই- তখন ভাবছি ট্রাই ব্রেকারে যেন না যায়। যাক ট্রাই ব্রেকারে আর যেতে হয়নি। আমি খুব নিস্পৃহ হয়ে খেলা দেখি, কোন দলের সমর্পিত সমর্থক না হয়ে। এই যে সব পাড়ায় পাড়ায় পতাকা ঝুলিয়ে, ছবি টানিয়ে মাতামাতি, এগুলো আমার পাগলামি বলেই মনে হয়। এই বিশ্বকাপের বাজারে একটা টি.ভি. চ্যানেলে বিতর্ক সভা বসেছিল। বিষয় ছিল, “বাঙালীরা ফুটবল খেলে না, দেখে। তাও আবার ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা”। বিতর্কে একজন বক্তা বললেন – বাঙালীরা খেলে না দেখে এইজন্য যে সেখানে হেরে যাওয়ার লজ্জার বা হাতে পায়ে চোট পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। নিরাপদ দূরত্বে বসে টি.ভি. তে খেলা দেখা আর ক্রমাগত বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের খুঁত ধরে সমালোচনা করে যাওয়া বাঙালীদের কাজ। কথাটা খুব খারাপ বলেনি। রাস্তাঘাটে-অফিস কাছারিতে দেখেছি সবাই বিশেষঙ্গ, শুধু খেলোয়ার কি কোচদের স্ট্রাটেজি নিয়ে কি আলোচনা। এই উন্মাদনা আছে বলেই না এত আয়োজন। কত কত কোটি টাকার বানিজ্য হয়ে গেল। টি.ভি. কোম্পানির। রাত দু’টোয় এমন টি.আর.পি. ভাবা যায়। আর আয়োজক দেশ দক্ষিন আফ্রিকা, সেখানে তো বানিজ্যের মহোৎসব। হোটেল, রেস্তরা, ট্যুর অপারেটর, স্যুভেনির বিক্রেতা- এদের রমরমা বাজার। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্বের বানিজ্যও তো কম কিছু না। কত নতুন নতুন নির্মান, সৌদর্য্যায়ন, সে এক বিশাল কর্মযষ্ণ। শহরের যা কিছু সম্পন্ন সম্ভ্রান্ত অতিথিদের চোখে অসুন্দর লাগতে পারে সে সমস্ত কিছু অপসারন করা, তারপর শহরের মুখে প্রসাধনের প্রলেপ দেওয়া। যাতে অতিথিরা দারিদ্র না দেখতে পায়। এক সাধারন মধ্যবিত্ত মানসিকতা যা আমরা নিজের মধ্যে বা নিজের চারপাশে হামেশাই দেখতে পাই। আমাদের দেশেও বিদেশী অতিথিরা এলে যতটা সম্ভব সুন্দর করে তুলে ধরার চেষ্টা করি। তাতে রাস্তার ধারে ফুটপাথের বাসিন্দাদের ধরে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয় বা সাময়িক হাজতে পুরে দেওয়া হয়। কিন্তু হাজতে পুরে দেওয়ার পর আর কাররই এদের কথা মনেও থাকে না। একবার হঠাৎ দেখা গেল বেশ কিছু মানুষ এরকম বিনা কারনে জেলে রয়ে গেছে দীর্ঘদিন। তখন এই বিষয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ একটা কবিতা লিখেছিলেন- “লজ্জা” (কবিতাটা নীচে দিয়ে দিলাম)। দক্ষিন আফ্রিকাতেও বিশ্বকাপের প্রাকপর্বে সৌদর্য্যায়নের নামে অনেক পুরোনো বাড়ি-ঘর, বিশেষতঃ যেগুলো গরিব গুর্বো মানুষগুলোর আস্তানা ছিল, সে গুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর ওখানকার বাসিন্দাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শহর থেকে বহু দূরে, অতিথিদের দৃষ্টির বাইরে। মানুষগুলো কোন রকমে মাথা গোঁজার একটা ঠাই হয়ত পেয়েছে কিন্তু লোকগুলো খাবে কি? এদের কেউ রাস্তায় মিষ্টি ফেরি করত, ভেবেছিল বিশ্বকাপের বাজারে ভালো রোজকার হবে, কিন্তু সে আশায় ছাই। কেউ টি.ভি. মেকানিক। তার কাজ শহরে, অতো দূর থেকে এসে পোষাবে কি করে। ফুটবলের বিশ্ব-উৎসবের শেষে আসুন আমরা একটু এদের কথাও ভাবি।

               "লজ্জা"
               -শঙ্খ ঘোষ

বাবুদের		লজ্জা হলো ।
আমি যে		কুড়িয়ে খাব
সেটা ঠিক		সইল না আর
আজ তাই		ধর্মাবতার
আমি এই		জেল হাজতে
দেখে নিই		শাঠ্যে শঠে ।

বাবুদের		কাঁচের ঘরে
কত-না		সাহেবসুবো
আসে, আর		দেশবিদেশে
ঊড়ে যায়		পাখির মতো
সেখানে		মাছির ডানায়
বাবুদের		লজ্জা করে ! 

আমি তা		বুঝেও এমন
বেহায়া		শরমখাকী
খুঁটে খাই		যখন যা পাই
সুবোদের		পায়ের তলায় ।
খেতা তো		হবেই বাবা
না খেয়ে		মরব না কি ?

বেঁধেছ		বেশ করেছ
কী এমন		মস্ত ক্ষতি !
গারদে		বয়েস গেল
তা ছাড়া		গতরখানাও
বাবুদের		কব্জা হলো--
হলো তো		বেশ, তাতে কি
বাবুদের		লজ্জা হলো ?  

Advertisements

9 Responses to বিশ্ব-উৎসবের শেষে

  1. সৌম বলেছেন:

    শহরের বাইরে যদি পুর্নাঙ্গ পুনর্বাসন দেয় আপত্তি কি?

  2. বাবু বলেছেন:

    বানিজ্যই তো সব। বানিজ্যে বসতঃ লক্ষী।

  3. কাজল বলেছেন:

    কবিতাটা বড় ভাল হে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: