6th August, 1945

(১৯৪৫-এর ৬ই আগষ্ট, সকাল আটটা বেজে পনেরো মিনিট, রৌদ্রকরোজ্জ্বল হিরোশিমার যে আকাশে উড়োজাহাজ ‘এনোলা গে’ ‘লিটিল বয়’কে বয়ে এনে ছেড়ে দিল, মাটি থেকে সেই ঊর্ধ্বাকাশে লক্ষ সূর্যের ঝলকানি থেকে তিন মাইল দূরে দাঁড়িয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়স্কা ফুতাবা কিতাইয়ামা। বিস্ফোরণের ছ’ঘন্টা পরে কন্ঠনালী গলে যাবার আগে রেডক্রশ প্রতিনিধিদের কাছে অভিঞ্জতার যে নিদারুন চিত্রটি দেখিয়েছিলেন বর্ণনায়–নীচের সংলাপগুলি তারই টুকরো অংশ।)

কে যেন চিৎকার করে উঠল—প্যারাস্যুট, পারাস্যুট নামছে, কানে যেতেই চমকে আকাশের দিকে তাকালাম। পরমুহূর্তেই এক ঝলক নীলাভ সাদা আলো, যার কোনো শিখা নেই, আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। দ্রুত ধাবমান রেলগাড়ির মতো পায়ের তলার মাটি দুলে উঠছে। মাটির ওপর আমি সটান পরে গেলাম। পরমুহূর্তেই ধ্বংসস্তুপের নীচে তলিয়ে যাচ্ছি, আমি চাপা পরে গেলাম বাড়িঘর, দেয়াল দরজা, কড়ি বরগার অন্ধকারে। তবু আপ্রান চেষ্টায় ভষ্ম আর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে কোনোক্রমে বেরিয়ে এলাম।

কিন্তু নিঃশ্বাস নিতে গিয়েই কিসের যেন গন্ধ টের পেলাম। সে গন্ধ যেন সহ্য করা যায় না। কিন্তু একি আমার মুখের চামড়ায় অসহ্য জ্বালা, চামড়া মাংশপেশী, শিরাতন্তুর গভীরে সীমাহীন যন্ত্রণা। জ্বালা আর যন্ত্রণার দুটি স্তর এত বিহ্বলতার মধ্যেও আমি স্পষ্ট টের পেলাম। জ্বালা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, কনুইএর পর থেকে নখের ডগা পর্যন্ত ফোস্কা। দু’হাতের চামড়া দেহ থেকে আলগা হয়ে বীভৎসভাবে ঝুলতে লাগল। আরে আমার পা-টা কই? কী ভাবে আমার ডান পা-টা খুলে গেল? পেছনে তাকালাম, ইট, কাঠ, ধ্বংসস্তুপের মধ্যে মাংসের গলিত নির্যাস সহ একটা পা। পাগলের মতো এক পেয়ে জন্তুদের মতো ধ্বংসস্তুপের ওপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নদীর দিকে চললাম।

সেতুর ওপর থেকে নীচে চাইতেই মূর্চ্ছা যাবার অবস্থা। হাজার হাজার মানুষ নদীর জলে কাঁকড়ার মতো দেহ মোচড়াচ্ছে। তাদের মুখ ফুলে গেছে, কিম্ভুতকিমাকার টসটসে বেলুনের মতো ফ্যাকাসে, সাদা কাগজের মতো পান্ডুর, আতংকের চাবুক খাওয়া যন্ত্রণাবিদ্ধ ভয়ার্থ মুখ, অক্ষিগোলক থেকে থকথকে জেলির মতো পদার্থ গলে গলে পড়ছে। নদীর জলে মরা কুকুর-বেড়ালের মতো ভেসে রয়েছে ছেঁড়া খোঁড়া সহস্র মানুষের শব। তারপরও শরীরের জ্বালা জুড়োতে যন্ত্রণার এক প্রাগৈতিহাসিক আদিম আর্তনাদে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পরতে চাইছে নদীর শীতল জলে।

গায়ের জ্বলুনি অসহ্য হয়ে উঠছে। আগুনে পুড়লে জ্বালা করে, কিন্তু এ দাহ যেন ভিন্ন ধরনের, সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। আমার হাত দুটো থেকে রক্তের বদলে বেড়িয়ে আসছে এক ধরনের হলুদ রস। আমি কুঁকড়ে যাচ্ছি, ছোটো হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ, অস্থি-মজ্জা ভেঙে, আমারই শরীরের গলে যাওয়া মাংসের গলিত স্তুপে বসে যাচ্ছি আমি। আমার পাশে একদল স্কুলের বাচ্চা, রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে প্রস্ফুটিত পুষ্পের মতো তরতাজা যে শিশুরা, মা মা বলে কাঁদতে কাঁদতে তারাও কেমন ধীরে ধীরে মোমের মতো গলে যাচ্ছে। গলে যাচ্ছে হাত-পা-বুক-পেট সারা শরীর, হলুদ রসের আস্তরনে ঢেকে যাচ্ছে সারা শরীর। ক্রমে আমার মাংশপেশী শক্ত হয়ে উঠলো, চোখের দৃষ্টিও ক্ষীন হয়ে আসছে। গালের ওপর পরম মমতায় হাত বুলিয়ে মুখের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করতেই হাতে উঠে এলো এক দলা গলিত মাংস। আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে আবার এক পেয়ে জন্তুর মতো ছুটতে লাগলাম। সেই ঝাপসা দৃষ্টির ঘোরে দেখলাম– বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ট্রাক বোঝাই শবদেহ। আর রাস্তার দু’পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে অসংখ্য নারী-পুরুষ, যেন নিশির ডাকে আধো চেতনার মধ্য দিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে হেঁটে চলেছে অমৃতের হতভাগ্য সন্তানেরা।
(ঋণ দেবু দত্তগুপ্তর কাছে)

Advertisements

19 Responses to 6th August, 1945

  1. mahmud faisal বলেছেন:

    এত বছর পর মানুষগুলোর জন্য খুব খারাপ লাগছে। 😦

  2. রফি বলেছেন:

    বড় করুণ বর্ননা দিয়েছ ভাই। অস্ত্রের আয়োজন যা করেছে সবাই মিলে তাতে পৃথিবী ধ্বংসের পক্ষে যথেষ্ট। যা পরিস্থিতি তাতে এশিয়া মহাদেশেই না আবার ন্তুন অস্ত্রের পরীক্ষা হয়।

  3. রথীন বলেছেন:

    ইরাক আর আফগানিস্থানের মাটিতে কত পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার হল তা নিয়েও লিখতে পারতে।

  4. তারা বলেছেন:

    এত বিভৎসতা সত্যেও যুদ্ধবাজরা দুনিয়া জুড়ে দাপাদাপি করে চলেছে।

    • তাপস বলেছেন:

      যুদ্ধের থেকে বড় ব্যবসা এখন আর পৃথিবী নেই। আর কেই বা না জানে যে বানিজ্যে বসতঃ লক্ষী। এছাড়া বন্দুকের নল নয় মানি ব্যাগ-ই যে ক্ষমতার আসল উৎস সেটাও ওরা ভাল জানে।

  5. সৌম বলেছেন:

    সেই সময়ের বোমায় যদি এই হয়, তবে এখনকার বোমায় কি হবে?

  6. সৌম বলেছেন:

    সেই সময়ের বোমায় যদি এই হয়, তবে এখনকার বোমায় কি হবে ?

  7. মুশারফ বলেছেন:

    বেদনাদায়ক। পড়তে পড়তে মুষ্টি শক্ত হয়ে ওঠে। লিখেছ ভাল।

  8. BABU বলেছেন:

    এর পরও আনবিক বোমা মজুত করে চলেছে শক্তিধর দেশ গুলো।

  9. নিবিড় বলেছেন:

    মাঝে মাঝে মনে হয় কিছু অভিজ্ঞতা হয়ত না পড়লেই ভাল হত

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: