পরমানু দায়বদ্ধতা বিল (Nuclear Liability Bill)


অবশেষে সংসদে পাশ হয়ে গেল পরমানু দায়বদ্ধতা বিল। এটাকে ঠিক ভাবে বললে পরমানু দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির বিল বলা উচিৎ। বিলটা নিয়ে সরকারের উৎসাহ এবং তা নিয়ে না না বিতর্ক অনেকদিন ধরেই চলছিল। সরকার চাইছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফরের আগেই বিলটা পাশ করাতে।

বিলটা নিয়ে বিতর্ক মোটামুটি তিনটি বিষয়ে–

১) যেখানে ১৯৬০ সাল থেকে দেশে পরমানু চুল্লী ব্যবহৃত হচ্ছে, হঠাৎ এখন কি এমন দরকার পড়ল নতুন বিলের।

২) ক্ষতিপূরনের পরিমান নিয়ে বিতর্ক। প্রথমে সরকার ঠিক করেছিল ৫০০ কোটি টাকা, পরে বিরোধিতার চাপে শেষ পর্যন্ত্য ১৫০০ কোটি টাকা নির্ধারন করেছে। যদিও এই পরিমান নিয়েও সঙ্গত বিরোধিতা আছে। যেখানে খোদ আমেরিকায় ক্ষতিপূরনের অঙ্ক ১১৯০ কোটি ডলার সেখানে আমেরিকান কোম্পানির জন্য এবং ভবিষ্যৎ ভারতীয় পরমানু উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা মাত্র ১৫০০ কোটি?

৩) এই আইন প্রচলিত সামাজিক দায়বদ্ধতা আইনকে লঙ্ঘন করছে। এবং মানুষের আদালতে যাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকেও লঙ্ঘন করছে। আমেরিকান কোম্পানির স্বার্থে সরকার ভারতীয় জনগনের fundamental rights কেড়ে নিচ্ছে।

তাহলে এই বিলের প্রয়োজন কী?
সরকারের কথায় – শুধু আমেরিকান কোম্পানি নয়, রাশিয়া, ফ্রান্স সব দেশের চুল্লী নির্মাতারাই এই দায়বদ্ধতা কমাতে বলছে। কিন্তু এসব কথায় সরকার যেটা লুকোতে চাইছে সেটা হল আমেরিকার কোম্পানীগুলোই এই আইন পাশকে সরবরাহের পূর্বসর্ত হিসেবে দিয়েছে। রাশিয়া কুদাঁকুলাম নিউক্লিয়ার প্রজেক্টে দু’টো চুল্লী দিয়েছে এবং ফ্রান্সও এভেরা চুল্লী দিয়েছে কোনো বিষেশ আইন ছাড়াই। তাহলে বিষেশ আইন ছাড়া কেউই চুল্লী দিতে রাজী হচ্ছে না এ কথা ধোপে টেকে না। আসল বিষয়টা আমেরিকান রাষ্ট্রদূত রোমার পরিষ্কার করে দিয়েছে। গত ১৫ই মার্চ সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমেরিকা চায় যত শ্রীঘ্র সম্ভব ভারত এই বিল পাশ করে ভারত-মার্কিন পরমানু চুক্তি সম্পূর্ণ করার দিকে এগোক। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে পরমানু চুক্তিরই একটা অঙ্গ এই পরমানু দায়বদ্ধতা বিল।

আমেরিকা চায় তার দেশের শিল্পপতিরা পরমানু চুল্লী নিয়ে ব্যবসা করুক, অন্য দেশে চালান দিক কোন দায়বদ্ধতা ছাড়াই। এবং এটা শুধুমাত্র ভারতের জন্য নয় সব দেশের জন্যই। মানে চুল্লী নির্মানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা নির্মানের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটির জন্য বা ত্রুটিপূর্ন যন্ত্রপাতি সরবরাহের কারনে কোনো দূর্ঘটনা ঘটলেও নির্মান সংস্থার কোনও ক্ষতিপূরন মেটানোর দায়বদ্ধতা না থাকা। আসলে আমেরিকা ১৯৫৭ সালে পাশ হওয়া প্রাইস আন্ডারসন এ্যাক্ট-এ ও দেশের পরমানু ব্যবসায়ীদের দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরনের আইনি দায়বদ্ধতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবসায়ীরা সারা পৃথিবীতে, যেখানে তারা চুল্লী সরবরাহ করবে, এই ছাড় চায়। আর সেই ছাড়, যেটাকে নিন্দুকেরা বলে নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রিকে সাবসিডি, দিতে আমেরিকার সরকারও সক্রিয়ভাবে সচেষ্ট। নিউক্লিয়ার সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীদের সংস্থা International Group on Nuclear Liability (CIGNL) যার সদস্য Babcock & Wilcox Company, Bechtel Power Corporation, BWX Technologies Inc, General Electric Company, USEC Inc, Washington Group International Inc, and Westinghouse Electric Company LLC- এদের মতো সরবরাহকারীরা। তারা আমেরিকা সরকারকে চাপ দিচ্ছে সারা পৃথিবীতে এই একই ধরনেরই আইন প্রনয়ন করার জন্য। এদের সংস্থার আইনজীবি ওমার ব্রাউন আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে চিঠি লিখে অনুরোধ জানিয়েছে রাশিয়াকে এই ধরনের আইন পাশ করানোর জন্য চাপ দিতে।

আমাদের সরকার আরো যে কথাটা বলে দেশবাসীদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে, সেটা হোল, ” পৃথিবীর সব দেশেই এই ধরনের আইন আছে”। কিন্তু সত্যিই কি তাই? জাপানে চুল্লী প্রস্তুতকারিদের দায়বদ্ধতা ১.২ বিলিয়ন ডলার, আর জাপান সরকারের দায়বদ্ধতার কোনো সীমা নেই। জার্মানী, ফিনল্যান্ড ইত্যাদী দেশে চুল্লী প্রস্তুতকারিদের দায়বদ্ধতা কোনো সীমায় বাধা নেই। রাশিয়াতেও এই ধরনের আইন নেই। প্রচলিত আইনেই দায়বদ্ধতা মেটাতে হবে। আর আমাদের দেশে আইনে চুল্লী প্রস্তুতকারিদের দায়বদ্ধতা প্রায় নেই। শুধুমাত্র ইচ্ছাকৃত বা বড়সর কোনো ত্রুটির ক্ষেত্রে (wilful act or gross negligence) কিছু দায়বদ্ধতা আছে। কিন্তু wilful act or gross negligence প্রমান করবে কে? বাকী দায়বদ্ধতা সরকার নেবে। তারমানে জনগনের ট্যাক্সএর টাকায় বিদেশী অপারেটরদের সাবসিডি দেওয়া হবে। এই জন্যই আমদের প্রধানমন্ত্রীকে সেরা বন্ধু বলেছিলেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি। আপাতত আমরা সেই আনন্দেই নাচি।

Advertisements

10 Responses to পরমানু দায়বদ্ধতা বিল (Nuclear Liability Bill)

  1. Farid Ahammad বলেছেন:

    http://www.bdtender.com একটি অনলাইন টেন্ডার/দরপত্র বিজ্ঞপ্তি পরিসেবা পোর্টাল। যেখানে বাংলাদেশের প্রায় সকল টেন্ডার/দরপত্রের (সরকারী এবং বেসরকারী সংস্থা থেকে প্রকাশিত) সাম্প্রতিক তথ্য প্রদান করা হয়। প্রায় ২০০০ নিবন্ধিকৃত সদস্যদেরকে নিয়মিতভাবে ইমেইলের মাধ্যমে সেবা প্রদান করে যাচ্ছে।
    দেশের সকল জাতীয় এবং আঞ্চলিক দৈনন্দিন সংবাদপত্র, প্রায় ৫৭ টি কাগজ এবং ২৫০টি ওয়েবসাইট থেকে টেন্ডার/দরপত্র সংগ্রহ করা হয়। সেইসাথে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, এনজিও এবং বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা,তাদের প্রয়োজনীয় টেন্ডার/দরপত্র বিজ্ঞপ্তি সমূহ এই সাইটে প্রকাশ করে থাকে।

  2. সঞ্জয় বলেছেন:

    এই জন্যই বামেদের ক্রীতদাস আর নই- বলেন মনমোহন ,

    বামেদের সমর্থনে UPA-1,আর TMC এর সমর্থনে UPA-2 এর তফাৎ এইটাই ,

    তাইতো বামেদের উপর আমেরিকার মদতে TMC , CONGRESS, BJP, MAOIST সব একত্রে এই তীব্র আক্রমন.

  3. বাবু বলেছেন:

    টাকা স্বর্গ, টাকা ধর্ম, টাকাহি পমমং তপঃ

  4. সৌম বলেছেন:

    কাটমানি। সব কাটমানির ধান্ধা।

  5. মোশারফ বলেছেন:

    কোম্পানিগুলোর দায়বদ্ধতা না থাক নেতাদের দায়বদ্ধতা আছে না? তাতে তুমি সন্দেহ প্রকাশ করছ? আমার নেতাদের উপর অগাধ আস্থা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: