‘ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় – কিছু প্রশ্ন’


বাঙালী কাঁকড়ার জাত। এই বহু প্রচলিত কথাটা আবারও প্রাসঙ্গিকভাবেই মনে এলো চিকিৎসা বিভাগে এবারের নোবেল পুরষ্কার ঘোষনার পর। চিকিৎসা বিঞ্জানে এবার নোবেল পুরষ্কার পেলেন ব্রিটিশ বিঞ্জানী প্যাট্রিক স্টেপ্টো ও রবার্ট এডওয়ার্ড। এনারা পৃথিবীর প্রথম ‘টেস্ট টিউব বেবীর’ জন্ম দেন ২৫শে জুলাই, ১৯৭৮। এর ঠিক ৬৭ দিন পরে ৩রা অক্টোবর, ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে ডাঃ সুভাষ মুখার্জী জন্ম দেন ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় টেস্ট টিউব বেবী ‘দুর্গার’। অবশ্য সেই স্বীকৃতি তিনি জীবিত অবস্থায় পান নি। সরকারীভাবে স্বীকৃত ভারতের প্রথম টেস্ট টিউব বেবীর জনক টি.সি. আনন্দ কুমার ডাঃ মুখার্জীর গবেষনার কাগজপত্র দেখে ওনাকেই পথিকৃৎ হিসেবে মেনে নেন। ডঃ কুমার বর্তমানে ডঃ সুভাষ মুখার্জীর স্মৃতি রক্ষার্থে reproductive biology নিয়ে গবেষণার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে লিপ্ত আছেন।

ডঃ সুভাষ মুখার্জী ১৯৭৮ সালে তার গবেষনায় সফল হওয়ার পর সরকার ও সহকর্মীদের কাছে তার কাজের স্বীকৃতির পরিবর্তে পেয়েছেন অপমান, উপহাস আর চুড়ান্ত লাঞ্ছনা। তাকে প্রথমে বদলী করা হয় কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাঁকুড়ায়। তারপর উনি হৃদ্ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ওনাকে বদলী করা হয় কলকাতায়, যেখানে চার তলায় রোজ সিড়ি বেয়ে তাঁকে উঠতে হত। জাপানে একটা সেমিনারে ওনার কাজের বিষয়ে বক্তৃতা করার আহ্বান পেয়েছিলেন, কিন্তু ভারত সরকার তাকে সেই সেমিনারে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। চুড়ান্ত হতাশায় তিনি ১৯৮১ সালের ১৯শে জুন নিজের বাসগৃহে আত্মহত্যা করেন।

১৯৭৮ সাল, পশ্চিমবঙ্গে তখন প্রগতিশীল বামফ্রন্ট সরকার। তাও একজন বিঞ্জানীর এই পরিনতি কেন? কি করেছিল বামফ্রন্ট সরকার? ১৮ই নভেম্বর ১৯৭৮ সরকার মেডিক্যাল এস্যোসিয়েশনের অধীনে একটা বিশেষঞ্জ কমিটি করে দেয়। তারা বিচার করবে যে টেস্ট টিউব বেবী সত্যিই তিনি করতে পেরেছেন কি না? তার বিরুদ্ধে অভিযোগও ছিল অনেক। তিনি দপ্তরের আমলাদের না জানিয়ে কেন মিডিয়াকে তার গবেষনার বিষয় জানিয়েছেন। তিনি কি করে তার ছোটো ফ্ল্যাটে সামান্য উপকরন নিয়ে এই কাজ করেছেন, যেখানে অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়েও অন্যেরা পারছে না। বিশেষঞ্জ কমিটি ডাঃ মুখার্জীকে অনেক অবান্তর প্রশ্ন করে কার্যত ওনাকে অপমান করে। ডাঃ মুখার্জীর দোষ ছিল তিনি কারও কাছে মাথা নোয়াতেন না। শেষ পর্যন্ত কমিটি রায় দেয় যে ডাঃ মুখার্জীর দাবী ভিত্তিহীন “Everything that Dr. Mukhopadhyay claims is bogus.” এই expart committee এর শীর্ষে ছিল Radio physicist এবং সদস্যদের মধ্যে ছিল একজন gynecologist, একজন psychologist, একজন physicist এবং একজন neurologist। এই সদস্যদের আধুনিক রিপ্রডাক্টিভ টেকনোলজি সমন্ধে ধারনা ছিল না। অথচ এদের নিয়ে গড়া হল কমিটি এবং এদের রায়ে নির্ধারিত হল এক গবেষকের ভাগ্য।

কমিটির গঠন এবং প্রশ্নাবলী থেকে এটা স্পষ্ট যে ওনার ঈর্ষান্বিত সহকর্মীদের উদ্দেশ্যই ছিল ওনাকে হেনস্থা করা। ‘যা আমরা পারি না তুমি কেন পারবে?’ এই মনোভাব দ্বারা মেডিক্যাল এস্যোসিয়েশন তথা তাঁর সহকর্মীরা চালিত হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন সরকারও কেন ওদের কথায় প্রভাবিত হলো? কেন এক প্রতিভাকে ঈর্ষার আগুন থেকে রক্ষা করতে পারলো না। কেন তাকে ‘চক্ষু বিভাগে’ বদলী করে গবেষণার সূযোগ বন্ধ করে দিল, মানসিক নির্যাতন করলো? এক্ষেত্রে কি সরকারও প্রতিভার থেকে আনুগত্যকেই বেশী গুরুত্বপূর্ন মনে করেছে?

ডঃ টি.সি. আনন্দ কুমারের উদ্যোগে উনি ভারবর্ষে স্বীকৃতি পান। এবং সর্বোপরি ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন প্রকাশিত মেডিক্যাল ‘ডিক্সেনারী অফ মেডিক্যাল বায়গ্রাফি’ প্রকাশিত বইতে পৃথিবীর ১০০ দেশের ১১০০ মেডিক্যাল সায়েন্টিস্টের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে, যারা এই বিঞ্জানে নতুন পথের দিশা দেখিয়েছেন। ভারতের মাত্র তিন জনের নাম এই তালিকায় আছে — ১) স্যার রোনাল্ড রস ২) উ. এন. ব্রহ্মচারী ৩) ডঃ সুভাষ মুখার্জী।

এটাই স্বস্তির যে শেষ জয় প্রতিভারই হয়, চাটুকারদের নয়।

Advertisements

18 Responses to ‘ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় – কিছু প্রশ্ন’

  1. baridbaran বলেছেন:

    আজ হঠাত এই লেখাটা চোখে পড়ে গেল|অনেক তথ্যই জানতে পারিনি যখন ড়া.সুভাস মুখোপাধ্যায়’কে অপমান করার জন্য ঘোঁট পাকিয়েছিল হিংসুটে ডাক্তারদের লবি| এরকম ঘটেছিল, এখনও ঘটছে, পরেও ঘটতেই থাকবে, যদি না আমরা সাধারণ অল্প ও মাঝারি শিক্ষিত মানুষদেরও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে ব্যর্থ হই| কত সহজে তা করা যায় সেটা নিয়ে সকলের মাথা ঘামানো দরকার| ভবিষ্যতে এরকম প্রতিভা বিনাশের পুনরাবৃত্তি তবেই বন্ধ করা সম্ভব হবে|
    শুভেচ্ছা জানিয়ে আপাতত ইতি টানলাম|
    ‘বারিদবরণ’

  2. Rana patwary বলেছেন:

    Assalamualikum…
    vhalo laaglo…chaliye jaan…abar ashbo…dhonnobad emon kisu post upohar debar janno.

  3. তারা বলেছেন:

    অনেক দিন নতুন লেখা পাচ্ছি না। কি হোলো?

  4. তাপসদা নতুন লেখা কবে পাচ্ছি 🙂

  5. অনেক কিছু জানলাম।শারদীয় শুভেচ্ছা দাদা।

  6. sanjoy বলেছেন:

    শেষ জয় প্রতিভারই হয় , ডাঃ সুভাষ মুখার্জী,সুভাষচন্দ্র বসু.সুভাষ চক্রবত্তী সবার ক্ষেত্রেই যা প্রযোজ্য.

  7. বাবু বলেছেন:

    সব থেকে বেশী করে চাই।। বশ্যতা মানা চাই। কি নাটকের গান?

  8. তারা বলেছেন:

    যে লোক গুলো ঐ তদন্ত কমিটিতে ছিল তাদের বিচার হওয়া উচিৎ।

  9. সৌম বলেছেন:

    এই ঘটনা নিয়ে তপন সিংহ ‘এক ডাক্তার কি মওত’ সিনেমা করেছিলেন। সত্যিই লজ্জ্বার কথা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: