স্বর্গে একদিন

“ওঠো ওঠো বঙ্গবাসী
ঘুমায়ো না আআআ..র”

কানের পাশে তারস্বরে চিৎকারে ঘুমটা চটে যেতে চোখ খুলেই দেখি আমার বিছানার পাশে মাথায় ঝুটি বাঁধা কপালে তিলক কাটা বীণা হাতে এক মূর্তি। দেখেই মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল, “কে হে তুমি আমার ঘরের মধ্যে সটান ঢুকে গেছ। সাহস তো কম নয়।”
মূর্তিমান স্মিত হেসে বলল, “শান্ত হও, আমি নারদ”।
“কে নারদ কোনও নারদ ফারদকে আমি চিনি না। কে তুমি ঠিক করে বলোতো বাপ। না হলে পুলিশ ডাকবো”।
“আরে আমি নারদ। স্বর্গের নারদ। ভগবান বিষ্ণুর সেবাদাস”
“অঃ বিষ্ণুর হেড চামচে নারদ। তা আমার কাছে কি চাই?”
“ব্রহ্মা তোমাকে স্বর্গের বিশেষ অধিবেসনে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে তোমার জন্য পুষ্পক রথ পাঠিয়েছেন।। আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। তোমার বাড়ীর ছাদে রথ অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নাও।”পুষ্পক রথের কথা শুনেই মনে বেশ পুলক জাগলো, ঝটপট তৈরী হয়ে ছাদে ঊঠে রথে চরে বসলাম।

মুহূর্তেই রথ উঠে গেল আকাশে। মেঘের উপর দিয়ে ভেসে ভেসে কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌছে গেলাম স্বর্গে, একেবারে সভাগৃহের সদর দরজায়। বাইরে অনেক দেবতাদের ভিড়। সবাইকে ব্রেকফাস্ট প্যাকেট দেওয়া হল; আমাকেও ব্রেকফাস্ট প্যাকেট দিল। ব্রেকফাস্ট সেরে চা খেয়ে শোভাযাত্রা শুরু হল। অসূরদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে শোভাযাত্রা স্বর্গের রাস্তা প্রদক্ষিণ করলো। তারপর সভাগৃহে প্রবেশ করে দর্শক গ্যালারীতে বসলাম।সভার প্রথমেই কিন্নর-কিন্নরীরা “ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি” এই বৃন্দ গানটি পরিবেশন করলো। তারপর সভার সভাপতি মনসাদেবী অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিপর্য্স্ত দেবতাদের উদ্দেশ্যে স্বস্তিবাক্য পাঠ করলেন। এরপর ব্রহ্মার প্রারম্ভিক ভাষন। ব্রহ্মা বিস্তারিত ভাবে বললেন স্বর্গে কি ভাবে সফল্ভাবে তৃনমূল স্তর পর্যন্ত গনতন্ত্রের চর্চা চলছে। এবং অসুরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে দেবতাদের কি কি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ব্রহ্মার পরে বিষ্ণু উঠলেন লেকচার দিতে। বিষ্ণুও অসুরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে কি করা দরকার সে বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান দান করলেন। উনি আরও বললেন, এই যুদ্ধ খুব কঠিন যুদ্ধ, অতএব আমি চাই প্রত্যেক দেবতা মর্তের ছত্রধর মাহাতোর মতো মোটা অঙ্কের জীবনবীমা করুক। যে দেবতা যত বেশী অঙ্কের বীমা করবে, তার যুদ্ধে তত বেশী গুরুত্বপূর্ন সেনাপতি পদ পাওয়া উচিৎ। বিষ্ণুর লেকচার শেষ হলে ইন্দ্র রাজকীয় প্রতিবেদন পেশ করলেন। তারপর মধ্যান্নভোজের বিরতি।

ভোজের স্থানে দেখি দেবতারা কি একটা বিষয় নিয়ে ফিস ফিস করছে। আমিও মর্তের লোক, PNPC (পরনিন্দা পরচর্চা) তে বিষেশ পারদর্শী। যতটুকু কানে এলো তাতে বুঝলাম কামদেবের সাম্প্রতিক কোনো কেচ্ছা নিয়ে এরা ফিস ফিস করছে। হঠাৎ দেখি নারদ এদিকেই আসছে। বেশ গদ গদ ভাবে নারদকে তৈল মর্দন করে ইনিয়ে বিনিয়ে কামদেবের কেশটা জানতে চাইলাম। নারদ বলল, ”আরে ভাই কি বলি- কামদেব গেছিল পশ্চিমের দিকে মিটিং করতে, সেখনে গিয়ে পঞ্চানন্দবাবার ঘরে রাত্রিবাস করে।” ”সেটা আবার কে?” আমি বললাম। “ছোট খাট আঞ্চলিক দেবতা, তো হোয়েছে কি, রাত্রে পঞ্চানন্দকে খুবসে সোমরস খাইয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে ফস্টি-নস্টি করে। এদিকে গ্রামের ডেঁপো ছোঁড়ারা জানতে পেরে হাতে নাতে ধরে ফেলে খুব পিটিয়ে বেঁধে রেখে দিয়েছিল। শেষে ব্রহ্মা ইনফ্লুয়েন্স খাটিয়ে উদ্ধার করে আনে।” ও এই ব্যাপার, এতোক্ষনে ফিসফিসানির কারনটা বোঝা গেল। মধ্যান্নভোজের বিরতির পর একে একে দেবতারা তাদের বক্তব্য পেশ করতে উঠে ব্রহ্মাকে বিস্তর তেল দিল। এদিক ওদিকের কথাবার্তায় কান পেতে শুনলাম দেবতাদের রাজসভার নাকি পুনর্গঠন হবে, তাই তেল দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। ঠান্ডা ঘরে বসে এই একঘেয়ে স্তুতিবাক্য শুনতে শুনতে ঘুম পেয়ে গেল। একটু বোধহয় ঘুমিয়েও পরেছিলাম। হঠাৎ সভায় একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হওয়ায় ঘুমটা ভেঙে গেল। কি ব্যাপার? সভায় এবার আগামী দিনের জন্য রাজসভার সদস্যদের নাম ঘোষনা হবে। কে হবে পরবর্তী ইন্দ্র সে নিয়ে সবাই ফিসফিসিয়ে আলোচনা করছে। কনিষ্ঠ পুত্রকে ব্রহ্মা যে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেন এটা সবারই জানা। ফলে সবাই আশা করছে বোধহয় ব্রহ্মা এবারই ছোট ছেলেকে ইন্দ্র বানিয়ে দেবেন। অবশেষে ব্রহ্মা আগামী রাজসভার সদস্যদের নাম ঘোষনা করলেন। না কনিষ্ঠ পুত্রকে ইন্দ্র এবারে করেন নি। কিন্তু রাজসভার সদস্য হিসেবে কামদেবের নাম ঘোষনা মাত্রই সভায় গুঞ্জন উঠলো, কিন্তু ব্রহ্মা নির্বিকার ভাবে বাকী নাম পরে গেলেন। তারপর “ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি” এই বৃন্দগানটি দিয়ে সভা শেষ হল।

সভার শেষে হল থেকে বেড়িয়ে আসছি, নারদ এসে হাতে একটা চোতা ধরিয়ে দিল, দেখি ব্রহ্মার লেখা, অনুরোধ করেছে রাত্রের ভোজ সভায় উপস্থিত থাকতে। এদিক ওদিক একটু ঘুরে, স্বর্গের বাগানে একটু বেড়িয়ে রাত্রে নারদের সঙ্গে হাজির হলাম ভোজসভায়। সভায় ঢুকতেই ব্রহ্মা ডেকে পাশে বসালেন। বললেন, “তোমাকে কেন আমন্ত্রণ জানালাম জান?” আমি ঘাঢ় নাড়লাম। ব্রহ্মা বললেন, “তুমি ব্লগে আজকাল লিখছ টিখছো, এই যে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচন, গনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার সফল প্রয়োগ, সেটা নিয়ে একটু লিখবে। অনেকে বলছে এটা আসলে ‘সোনার পাথর বাটি’, বলছে আমি নাকি একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছি। সেটা যে সত্যি নয় সেটা সবাইকে জানাবে।” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন যাও আসনে বসে উপভোগ কর ঊর্বসীর নৃত্য। একে একে ঊর্বসী, রম্ভা সব সুন্দরীরা নাচলো, আর দেবতারা দেদার সোমরস পান করে হল্লা করতে লাগল। আমার একটু খিদে খিদে পাচ্ছিল, সোজা চলে গেলাম যেখানে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে সেদিকে। বুফে সিস্টেমে খাওয়া। আমি সোনার প্লেটে একটা গোটা মুরগীর রোস্ট তুলে নিয়ে কামড় বসাতে যাচ্ছি- হঠাৎ ‘কুক্কুর কু’ করে মুরগীটা ডেকে ঊঠলো। চমকে ঊঠলাম এ কিরে বাবাঃ, হাত থেকে প্লেটটা পড়ে গেল। কিন্তু তবুও ডাকের বিরাম নেই, সমানে ডেকে চলেছে ‘কুক্কুর কু’ করে।

ধরমর করে ঊঠে বসলাম মোবাইলে এলার্মটা বেজেই চলেছে ‘কুক্কুর কু..কুক্কুর কুউউ’।

Advertisements

16 Responses to স্বর্গে একদিন

  1. Shafi Islam বলেছেন:

    লেখাটি খুব ভহাল লাগলো।

  2. Harun বলেছেন:

    ভালো লেগেছে

  3. rongtuli বলেছেন:

    “ক্ষমতার রঙ যাই হোক ঢংটা একই।” দারুণ একটা কথা বলেছেন দাদা। এমনটাতো হওয়ার নয়,তারপরেও এটাই হয়। লেখটা বেশ ভাল লাগল। 🙂

  4. Mala Ganguly বলেছেন:

    khub sundor lekha. ak niswase pore fela jay.

  5. sanjoy বলেছেন:

    ব্রহ্মা ,বিষ্ণু kamdebuder kamdhonu. কনিষ্ঠ পুত্র lok savate ব্রহ্মা ke dubiche.

  6. নীলা বলেছেন:

    খুবই উচ্চ মার্গের লেখা। মূল মানে বা উদ্দেশ্যটা হয়তো আমিও বুঝতে পারিনি,কিন্তু পড়তে ভালো লেগেছে।
    নতুন বছরের শুভেচ্ছা।ভালো থাকবেন।

  7. তারা বলেছেন:

    ভাল লিখেছ। তবে পুরোটা বুঝলাম না। সবটা বুঝলে আরও ভাল লাগতো।

  8. মোশারফ বলেছেন:

    দেবতাদের নিয়ে ফাজলামি? দেখাচ্ছি মজা।

  9. জয় সরকার বলেছেন:

    খুবই ভালো লাগল গপ্লটা………অসাধারণ।

  10. অন্য এক তাপসদাকে আবিষ্কার করলাম আজ 😀
    খুব আনন্দ পেয়েছি গল্পটা পড়ে। ভেতরের অর্থটা ঠিক এখনো ধরতে পারি নাই। তৃণমূল, সিপিএম টেম নিয়ে লিখছেন কিনা ভাবছি 😛

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: